Monday, August 26, 2013

অধিক ফলনের নিশ্চয়তা বীজের স্বাস্থ্য উন্নয়ন

অধিক ফলনের নিশ্চয়তা বীজের স্বাস্থ্য উন্নয়নবীজ কৃষির প্রথম এবং প্রধান ভিত্তি। ফসল উৎপাদনের অন্য সব কৃষি উপকরণের কমতি, ঘাটতি বা অনুপস্থিতিতেও ভিন্নমাত্রায় ফলন আসে। কিন্তু বীজ ছাড়া কোনো ফলনই আশা করা যায় না। ফসল উৎপাদনে বীজ যত ভালো হবে উৎপাদনও তত বৃদ্ধি পাবে।বীজ কৃষির প্রথম এবং প্রধান ভিত্তি। ফসল উৎপাদনের অন্য সব কৃষি উপকরণের কমতি, ঘাটতি বা অনুপস্থিতিতেও ভিন্নমাত্রায় ফলন আসে। কিন্তু বীজ ছাড়া কোনো ফলনই আশা করা যায় না। ফসল উৎপাদনে বীজ যত ভালো হবে উৎপাদনও তত বৃদ্ধি পাবে।
বীজের নানাবিধ সংজ্ঞা আছে। সহজ সরল ভাষায় বলা যায়, উদ্ভিদের বা ফসলের যে অংশ চারা/গাছ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় তা-ই বীজ। ক্ষেত্রবিশেষে পরিপক্ব আসল বীজ, কা-ের অংশ, মূলের অংশ, পাতার অংশ অন্য কোনো উপযোগী অংশ। বীজের মন, স্বাস্থ্য যদি যথাযথ না হয় তাহলে উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া শতভাগ ভেস্তে যাবে। তাই শুরুতে জানতে হয় ভালো বীজের বৈশিষ্ট্য কেমন_
ষ ভালো বীজ পুষ্ট
ষ কাঙ্ক্ষিত আকারের, সম আকারের দানা
ষ উজ্জ্বল রঙ
ষ চিটামুক্ত, বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন
ষ পোকামাকড় ও রোগমুক্ত
ষ শতকরা ৮০ ভাগ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতাসম্পন্ন
ষ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদার্থমুক্ত
ষ অন্য বীজের মিশ্রণমুক্ত।
এ তো গেল ভালো বীজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় ভালো বীজ ব্যবহার করব কেন বা ভালো বীজ ব্যবহার করলে কী লাভ হয়? এর জবাবে বলা যায়_
ষ বেশি ফলন পাওয়া যায়
ষ বেশি লাভ আসে
ষ উৎপাদন খরচ কমে
ষ বীজ কম লাগে
ষ বালাইয়ের আক্রমণ কম হয়
ষ ভালো বীজ ব্যয়সাপেক্ষে নয় বরং আয়ের উৎস।
বীজের উৎস : গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএডিসির ডিলার/বিশুদ্ধ কোম্পানি/ডিলার/নিকটাত্মীয়/বিশ্বস্ত বীজ উৎপাদনকারী থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের দেশের কৃষক প্রচলিত ধারায় ফসল উৎপাদন করে এবং এই সঙ্গে উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ বীজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যা সুনিশ্চিত করে বীজ উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে সাধারণ কৃষক এখনো পূর্ণ সচেতন নয়।
সে জন্য দেশের কৃষি ফলন বীজের স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পেঁৗছাতে পারেনি। সারা দেশে এখনো মানসম্মত বীজের সরবরাহ ৫-১০ শতাংশের বেশি নয়। অথচ আমাদের মানসম্মত বীজ দিয়ে পেঁৗছাতে হবে শতভাগে। শুধু ভালো বীজ ব্যবহারের জন্য ফসলের উৎপাদন কমপক্ষে ১০ ভাগ বাড়ে। বীজের স্বাস্থ্য সমুন্নত রেখে অধিক উৎপাদনের জন্য আমাদের যেসব কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ যত্ন দেয়া প্রয়োজন তা হলো_
বীজ বাছাই : বীজ উৎপাদনে বীজ বাছাই আবশ্যকীয় কাজ। বিভিন্ন পদ্ধতিতে বীজ বাছাই করা যায় যেমন_
ক. কুলা দিয়ে : কুলা দিয়ে ঝেড়ে বা বাতাসে উড়িয়ে চিটা, অর্ধপুষ্ট, পুষ্ট বীজ আলাদা করা যায়।
খ. হাতবাছাই : হাত দিয়ে ভালো, খারাপ, দাগযুক্ত, ভাঙা, বিবর্ণ, ছোট দানা, ইট-পাথরের কণা এসব একবারে বাছাই করা হয়। পরে শুধু ভলো বীজ কাজে লাগানো হয়।
গ. পানি দিয়ে বাছাই : বালতি বা অন্য কোনো পাত্রে ৪০ লিটার পানির সঙ্গে দেড় কেজি ইউরিয়া মিশিয়ে এর মধ্যে বীজ ছেড়ে দিতে হয়। ভারী, স্বাস্থ্যবান, পুষ্ট বীজগুলো পানির নিচে জমা হবে। আর অপুষ্ট, হালকা, রোগাক্রান্ত, ভাঙা বীজ পানির ওপর ভেসে থাকবে। ভাসমান বীজগুলো ওপর থেকে আলাদা করে নিতে হবে। ইউরিয়ার পরিবর্তে লবণও ব্যবহার করা যায়। এরপর দ্রবণের নিচে জমা বীজগুলো তুলে নিয়ে পরিষ্কার পানিতে তিন-চার বার ধুয়ে ছায়ায় শুকিয়ে বীজতলায় বপন করতে হবে।
বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা : যে কোনো সময় বীজতলায় বীজ বপনের আগে অবশ্যই বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করে নিতে হবে। কমপক্ষে শতকরা ৮০ ভাগ গজানো বীজ বপনের উপযুক্ত বলে ধরে নিতে হবে। ভেজা কাপড়, বালিভর্তি মাটির পাত্র, নিউজ পেপার, কলার পাতা, খোল এসব দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করা যায়। প্রতি ক্ষেত্রেই ১০০টি বীজ নিয়ে ভলোভাবে বিছাতে হবে। প্রতিদিন হালকা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। এরপর ভালোভাবে অঙ্কুরিত হলে গণনা করতে হবে। ভালোমানের বীজ নিশ্চিত হওয়ার পরই বীজতলায় বপনের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
বীজতলা : আমাদের দেশে সময়, স্থান, অবস্থাভেদে বিভিন্ন ধরনের বীজতলা করা হয়। এর মধ্যে শুষ্ক, ভেজা, কাদাময় বীজতলা বেশি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া শুকনা, দাপোগ, ভাসমান বীজতলা প্রয়োজনবোধে করা যায়।
বীজতলার জন্য দো-অাঁশ বা বেলে দো-অাঁশ মাটি বেশি ভালো। বীজতলার মাটিতে প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে দু-তিনটি চাষ মই দিয়ে অন্তত ৭-১০ দিন পর্যন্ত জমিতে পানি আটকিয়ে রাখতে হবে। এরপর ভালোভাবে চাষ মই দিয়ে চূড়ান্তভাবে বীজতলা তৈরি করতে হবে।
আগেই অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করা বীজ ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে আউশ/আমনের জন্য দুই দিন এবং বোরোর জন্য তিন দিন জাগ দিয়ে মুখ ফাটলে বীজতলায় বীজ ফেলতে হবে। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ২ হাজার করে জায়গার জন্য ৮০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজতলার একক জমির চারা দিয়ে ২০-২৫ গুণ মূল জমিতে রোপণ করা যায়। বীজতলায় সব সময় পানি রাখা, শীতকালে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়া, চারা হলুদ হয়ে গেলে ২ হাত দৈর্ঘ্য, ২ হাত প্রস্থ জায়গার জন্য ৭ গ্রাম হারে ইউরিয়া প্রয়োগসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাজ যথাযথভাবে করতে হবে।
চারা উঠানো : চারা উঠানোর আগে বেশি করে পানি দিতে হবে যাতে মাটি নরম হয়ে যায় এবং চারা তুলতে সহজ হয়। যত্নসহকারে চারা তুলতে হবে যাতে চারা বা চারার শেকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। চারা তোলার পর পরই লাগানো ভালো। যদি লাগাতে দেরি হয় তাহলে ছায়ায়, আলোবাতাসযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মূল জমিতে লাগাতে হবে।
চারা রোপণ : চারা লাগানোর আগে জমিকে ৫-৬টি আড়াআড়ি চাষ দিয়ে ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হবে। মৌসুমওয়ারি চারার বয়স ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে আউশ মৌসুমে ২০-৩০, আমন মৌসুমে ৩০-৩৫ এবং বোরো মৌসুমের জন্য চারার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে বেশি ভালো। চারা অবশ্যই লাইনে রোপণ করতে হবে। লাইন থেকে লাইন ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১০-১৫ সেন্টিমিটার বজায় রাখতে হবে। প্রতি গুছিতে ২-৩টি চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের সময় গভীর করে রোপণ করলে কুশির সংখ্যা কম হলেও ফলনশীল কুশির সংখ্যা বাড়ে। তবে রোপণের দূরত্ব জমির উর্বরতা, জাত, মৌসুম ও রোপণ সময় অনুসারে ভিন্ন হয়।
মৌসুম, জাত জমির উর্বরতার জন্য অঞ্চলভেদে সারের মাত্রা ভিন্ন হয়। তবে গড়ে প্রতি বিঘার জন্য আমন ধানে ইউরিয়া, এমপি, জিমসাম ও দস্তার অনুপাত হবে ২০:২৫:১৫:১০:০৮:১.৫ কেজি আর বোরোর জন্য একই পরিমাণ জমিতে সারের মাত্রা হবে ২৫:৩০:১৭:১৫:০৮:১.৫ কেজি। ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরি প্রয়াগ হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে।
আগাছা দমন : আগাছ শুধু খাদ্যেই ভাগ বসায় না, আলো, বাতাস ও বৃদ্ধিতেও ভাগ বসায়। বিশেষ করে অপকারী বা ক্ষতিকারক পোকা রোগের পোষক হিসেবে কাজ করে। আউশ-আমন মৌসুমে রোপণের পর ৩০-৪০ দিন আর বোরো মৌসুমে ৪০-৫০ দিন জমি যে কোনোভাবেই আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা : রোপণের সময় থেকে কাইচ থোড় আসা পর্যন্ত জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে। কাইচ থোড় আসার পর পানির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। সারের ওপর প্রয়োগের সময় পানি কমিয়ে দিতে হবে, আবার প্রয়োগের দু-তিন দিন পর পানি দিলে সারের কার্যকারিতা বাড়ে। ধান শক্ত হওয়া শুরু হলে জমি থেকে পানি সরিয়ে নিতে হবে।
বালাই ব্যবস্থাপনা : পরিকল্পিতভাবে ধানের আবাদ করলে বালাইয়ের আক্রমণ কম হয়। তবে পুরো জীবনকার সময়ে পোকা বা রোগের আক্রমণ দেখা দিলে শুরুতেই বালাইনাশক প্রয়োগ না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
বিজাত বাছাই (রগিং) : কোনো কাঙ্ক্ষিত ফসলের জমিতে নির্দিষ্ট জাত ছাড়া অন্য যে কোনো জাতের উপস্থিতি থাকলে জাতের বিশুদ্ধ, মান সবই নষ্ট হয়। সে জন্য বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিজাত বাছাই আবশ্যকীয় কার্যক্রম। বিজাত বাছাইকালে কাঙ্ক্ষিত জাত ছাড়া অন্য সব জাত, রোগাক্রান্ত জাত, রোগাক্রান্ত শীষ এবং আগাছা বাছাই করতে হয়। বীজ উৎপাদন কৌশলে অন্তত তিনবার বিছাত বাছাই করতে হয়। প্রথমবার রোপণের ৪০ দিন পর সর্বোচ্চ কুশি অবস্থায়, দ্বিতীয়বার শীর্ষ বের হওয়ার আগ থেকে ৭-১০ দিন পর এবং তৃতীয়বার ফলস কাটার ৭-১০ দিন আগে করতে হয়।
ফসল কাটা, মাড়াই ও শুকানো : জমিতে ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ধানের চাল শক্ত এবং স্বচ্ছ হলে ধান কাটতে হয়। বেশি পাকলে ধান ঝরে যায়। বীজ ধান কাটার পর মাঠে ফেলে না রেখে যথাসম্ভব ভালো ফ্লোরে মাড়াই, ঝাড়াই করে শুকিয়ে নিতে হবে। মাড়াই, ঝাড়াইয়ের সময় খেয়াল রাখতে হবে বীজের গায়ে যেন কোনো আঘাত না লাগে। বীজ রোদে তিন-চার বার শুকিয়ে আর্দ্রতা ১২ ভাগ পর্যন্ত আনতে হবে। দাঁত দিয়ে বীজ কাটলে কটকট শব্দ হলে বুঝতে হবে বীজ ভালোভাবে শুকিয়েছে।
সংরক্ষণ : বীজ শুকানোর পর ঠা-া করে সংরক্ষণ করতে হবে। প্লাস্টিক ড্রাম, টিনের বা মাটির পাত্রে (আলকাতরা বা রঙ দিয়ে প্রলেপ দেয়া) বীজ রেখে ভালোভাবে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি ভালো হয় পাত্রের তলায় এক স্তর শুকনো পরিষ্কার ঠা-া বালু, মাঝে এক খ- চুন এবং বীজের ওপর বা বীজপাত্রের মুখে শুকনো নিম বা নিশিন্দা বা বিষকাটালীর পাতা গুঁড়া করে রেখে দেয়া পাত্রটি সম্পূর্ণ বীজ দিয়ে পূরণ করা না গেলে খালি অংশ শুকনো তুষ বা ছাই বা কাঠের গুঁড়া, চকপাউডার দিয়ে ভর্তি করিয়ে নিতে হবে। সংরক্ষণ করা বীজ মাঝেমধ্যে পরীক্ষা করে নিয়ে প্রয়োজনে শুকিয়ে নিতে হবে। বীজপাত্রটি মাচার ওপর রেখে দিতে হবে।
মোটামুটিভাবে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা সবাই ইচ্ছা করলে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করতে পারি এবং বীজের স্বাস্থ্য সঠিক রেখে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে পারি। তবে বীজ উৎপাদন কৌশলে স্থানীয় বস্নক সুপারভাইজারের পরামর্শ গ্রহণ করলে বেশি লাভবান হওয়া যায়।
সূত্র - দৈনিক যায় যায় দিন, প্রখ্যাত উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ ড. এম এ তাহের মিয়া 

0 comments:

Post a Comment