Sunday, October 6, 2013

সম্ভাবনা প্রতিদিন - ঔষধি গাছের দশটি গ্রাম

ঔষধি গাছের দশটি গ্রাম - সম্ভাবনা প্রতিদিন

এই দশ গ্রাম এবং এর আশপাশের এলাকার মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর, বমি বমি ভাব, আমাশয়, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে সড়কের পাশের ঔষধি গাছ থেকে ফল, বাকল, পাতা সংগ্রহ করে তা দিয়ে ওষুধ বানিয়ে সেবন করেন।

 

জেলার মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার ১০টি গ্রামের মানুষ সর্দি-কাশি, আমাশয়, ডায়রিয়া ইত্যাদি সাধারণ রোগ চিকিত্সার জন্য আর ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছেন না। বরং তারা ভেষজ উদ্ভিদ বা ঔষধি গাছ ব্যবহার করেই ভালো ফল পাচ্ছেন। 

কাশিয়ানী উপজেলার হিরণ্যকান্দি, জোনাসুর, মাঝিগাতি, গেড়াখোলা, মুকসুদপুর উপজেলার সালিনাবক্সা, দাসেরহাট, হোগলাকান্দি, খড়িকাইন, পুরাতন মুকসুদপুর ও কদমপুর এখন ঔষধি গাছের গ্রাম হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। সুফলভোগীরা গাছের ছাল, বাকল, পাতা ও ফল বিক্রি করে বেশ দু'পয়সা রোজগার করছেন। এসব ঔষধি গাছপালা রোগবালাই সারাতে যেমন কাজে লাগছে, অর্থ উপার্জনেরও একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। এ কারণে এলাকার মানুষ ঔষধি বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

শুরুর কথা

ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক নির্মিত হওয়ার পর এ সড়কের দুইপাশে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. নলিনী রঞ্জন বসাক ঔষধি গাছ রোপণ ও খাদে মত্স্য চাষের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ২০০৫ সালের আগস্টে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা 'রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফোরাম' সড়ক ও জনপথ এবং বন বিভাগের সহযোগিতায় এই মহাসড়কের দুইপাশে কাশিয়ানী উপজেলার হিরণ্যকান্দি থেকে মুকসুদপুর উপজেলার কদমপুর পর্যন্ত ১০টি গ্রামের ১০ কিমি এলাকা জুড়ে সমিতির সদস্যদের মাধ্যমে ৩৭ হাজার নিম, আমলকী, হরিতকি, বহেড়া, অর্জুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করা হয়। সঙ্গে লাগানো হয় ঘৃতকুমারী, কালোমেঘ, উলটকম্বল, বাসক ইত্যাদি গাছের চারা। সড়কের খাদে মত্স্য চাষ করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়ে। ভেস্তে যায় মাছ চাষ। সামাজিক বনায়ন সমিতির ১৪০ জন সুফলভোগী পাহারা দিয়ে, পরিচর্যা করে ২১ হাজার গাছ বাঁচাতে সক্ষম হন।

বৃদ্ধি পাচ্ছে উপার্জনের ক্ষেত্র 

প্রথম বছরই ঘৃতকুমারী, কালোমেঘ, উলটকম্বল বাসক থেকে সুফলভোগীরা ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। ৫ বছরের মাথায় লম্বু, মেহগনি প্রভৃতি বনজ বৃক্ষের ডালপালা ছেটে জ্বালানি হিসাবে বিক্রি করে সমিতির সদস্যরা এক লাখ টাকা আয় করেন। এছাড়া এখানে লাগানো খেজুর, তাল, কাঁঠাল ইত্যাদি ফল বিক্রি করে সমিতির সদস্যরা ভালোই রোজগার করেন। এ বছর সমিতির সদস্যরা ৫০ হাজার টাকার নিমপাতা, আমলকী ও অর্জুনের ছাল বিক্রি করেছেন। বহেড়া ও হরিতকি বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। এখন বনজ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষ যতই বড় হচ্ছে সুফলভোগীদের আয় ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

এলাকাবাসী উপকৃত হচ্ছেন

২০১০ সাল থেকেই আমলকী, হরিতকি, বহেড়া গাছে ফল ধরছে। এই দশ গ্রাম এবং এর আশপাশের এলাকার মানুষ সর্দি, কাশি, জ্বর, বমি বমি ভাব, আমাশয়, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হলে বিনামূল্যে সড়কের পাশের ঔষধি গাছ থেকে ফল, বাকল, পাতা সংগ্রহ করে তা দিয়ে ওষুধ বানিয়ে সেবন করেন। 

দাসেরহাট গ্রামের হাসেম আলী বলেন, নিমের পাতা, অর্জুনের ছাল, আমলকী, হরিতকি, বহেড়া নানা রোগ চিকিত্সায় যথেষ্ট কার্যকর। আমরা সর্দি, কাশিসহ সাধারণ অসুখ-বিসুখে ছোটবেলা এসব গাছের ফল, বাকলের রস খেয়ে সুস্থ হতাম। মাঝে এসব গাছ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। আবার আবাদ করায় আমরা বিনা পয়সায় এসব গাছ থেকে ফল ও ছাল নিয়ে অসুখ থেকে মুক্তি পাচ্ছি। এ্যলোপাথি ওষুধ কিনতে প্রচুর টাকা প্রয়োজন হয়। পক্ষান্তরে গ্রামের মানুষ ঔষধি গাছ থেকে বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করছে।

ফল ও বাকলের চাহিদা যথেষ্ট

এ বছর আমলকী, নিম পাতা ও অর্জুনের ছাল বিক্রি করে সমিতির সদস্যরা ৫০ হাজার টাকা আয় করেছেন। এছাড়া হরিতকি ও বহেড়া বিক্রি থেকে এ বছর আরো ৫০ হাজার টাকা আয় হবে বলে তারা আশা করছেন। আয়ের সব টাকা সমিতির সুফলভোগীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে বলে জানা গেছে। 

সুফলভোগী ও মহিলা গ্রুপ লিডার সুনীতি বসাক বলেন, সমিতির সদস্যরা বৃক্ষ রোপণ করে পাহারা দিয়ে, পরিচর্যা করে বড় করেছেন। এখন আমাদের সুদিন এসেছে। এসব ঔষধি গাছ থেকে আমরা ভালোই আয় করছি। প্রতি বছরই আমাদের আয় বৃদ্ধি পাবে।

সুফলভোগী মিজান মুন্সি ও মোঃ শুকুর আলী ফকির বলেন, আগে গ্রামের মানুষ ঔষধি গাছের ফল, বাকল, পাতা সংগ্রহ করে তা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে খেয়ে রোগ থেকে মুক্তি পেত। মাঝে এসব গাছ কমে গিয়েছিল। 

ঔষধি ফল ও ছালের বাজার 

ফড়িয়া আবু বক্কার মোল্লা (৬৫) বলেন, আমাদের দেশে ঔষধি গাছের ফল, পাতা ও ছালের বিশাল বাজার রয়েছে। এসব জিনিসের ওপর নির্ভর করে দেশে অনেক কোম্পানি গড়ে উঠেছে। তারা ভেষজ ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরি করছে। ভেষজ ওষুধ ও প্রসাধনী প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। আমরা গ্রাম থেকে নিম পাতা, আমলকী, বহেড়া, হরিতকি ও অর্জুনের ছাল কিনে নিয়ে ঢাকায় সাধনা, শক্তি ঔষধালয়সহ বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করি। এ থেকে আমাদের ভালোই আয় হয়। গোপালগঞ্জের এ ভেষজ বাগানের গাছ বড় হলে ফল ও ছাল বেশি পাওয়া যাবে। এখান থেকে সুফলভোগীদের আয় প্রতিবছর বাড়বে। উত্পাদন বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন কোম্পানি সরাসরি তাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনে নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

কাশিয়ানী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, ঔষধি গাছ মানুষের জন্য প্রকৃতির অমূল্য দান। এলাকার মানুষ নলিনী রঞ্জন বসাকের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঔষধি গাছ লাগিয়ে এলাকার মানুষ ও নিজেদের জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছেন। এলাকার মানুষ বিনা পয়সায় ঔষধি গাছ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। আবার আবাদকারীরা অর্থ আয় করছেন। ভেষজ ওষুধ সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকায় মানুষ ভেষজ ওষুধ ও ভেষজ প্রসাধনীর ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। 

পরিবেশ কর্মীর বক্তব্য 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশর কো-অর্ডিনেটর আব্দুস সবুর লস্কর ও পরিবেশ কর্মী মোঃ শাহজাহান সাজু বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঔষধি গাছের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যেকোন গাছই দূষিত বাতাস গ্রহণ করে নির্মল বাতাস প্রদান করে। তবে ঔষধি গাছের কিছু কিছু বাড়তি গুণ রয়েছে। যেমন নিম গাছের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বাতাস অনেক রোগ-বালাই দূরে রাখতে সাহায্য করে। এই বাতাস ফসলের ক্ষেতে কীটনাশকের মতও কাজ করে। 

উদ্যোক্তার বক্তব্য 

প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. নলিনী রঞ্জন বসাক বলেন, প্রথমদিকে মানুষ ঔষধি গাছের আবাদের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। আস্তে আস্তে তারা যখন রোগমুক্তিতে ঔষধি বৃক্ষ থেকে উপকার পেতে শুরু করেন ও সুফলভোগীরা অর্থের মুখ দেখছেন তখন এর গুরুত্ব বেড়েছে। কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর উপজেলার ১০টি গ্রামে ঔষধি গাছের আবাদ সফল হয়েছে। এখন স্থানীয়রা এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। গ্রামগুলো এখন ঔষধি গাছের গ্রাম হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। অর্থনৈতিক ও চিকিত্সার দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ গাছের চাষ এলাকায় সম্প্রসারিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক।


0 comments:

Post a Comment