কৃষকের ত্রাতা ও বন্ধু - হৃদয়ের মানুষ শাইখ সিরাজ
কণ্ঠে তার বাজে মাটির সুর
শাইখ সিরাজ। বাংলাদেশেরই স্বশিক্ষিত কৃষি এবং পরিবেশ উন্নয়নকর্মী। প্রায় তিন দশক ধরে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশের কৃষি এবং কৃষকদের বৈপ্লবিকভাবে তুলে এনেছেন গণমাধ্যমে। ক্ষেতের কৃষকের সঙ্গে গণমাধ্যমের যোগসূত্র নির্মাণে রেখেছেন অনবদ্য ভূমিকা যা প্রভাবিত করেছে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এবং বাংলার অগণিত প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকের মন। অবহেলিত কৃষককুল আর কৃষিকে তিনি নজরে এনেছেন নগরের মানুষের কাছে। উদ্দীপ্ত এই মানুষটি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন খামখেয়ালি প্রকৃতির সঙ্গে সদা যুদ্ধরত এবং সমাজ-রাষ্ট্রের চোখে অবহেলিত ও বঞ্চিত বাংলার কোটি প্রান্তিক কৃষক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। গণমাধ্যমই হয়ে ওঠে তার একমাত্র অস্ত্র। যেখানে কৃষিপ্রযুক্তি এবং কৃষির ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সম্মিলন কৃষকের দৃঢ়তা এবং সাফল্যের প্রধান নিয়ামক। আমাদের মাঝে অনেকেই বাস করেন যারা অসাধারণ উদ্যোগী মনোভাবের, আবার কেউ বা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ ব্যবহারের নানা পথ দেখিয়ে চলেছেন। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ তেমনি এক মাটির সন্তান, যিনি আবিষ্কার করেছেন জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার বিবিধ দিকনির্দেশনা। কৃষি আবাদের ইতিবাচক দিকগুলো শিখে কৃষক কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে প্রকৃতিরই অমূল্য দান, মাটিরÑ তার এমন সব কর্মযজ্ঞ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। কৃষিক্ষেত্রে ‘কী হতে পারে’ আর ‘কী হতে পারে না’Ñ এমন বার্তা তিনি ছড়িয়ে চলেছেন আর অনুপ্রাণিত করছেন অগণিত কৃষককে। কৃষকের নতুন কৃষি উদ্ভাবন গ্রামীণ এবং নগরের তথা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে জানান দেওয়ার নিরলস কাজটি করে চলেছেন শাইখ সিরাজ, যাতে দেশ আরও কল্যাণকর একটি ভবিষ্যতের দিশা পেতে পারে।
১২ বছরে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ
এ সেøাগান হৃদয়ে ধারণ করে শাইখ সিরাজ বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অনুকূল কৃষি-পরিবেশ, বৃহৎ কৃষি জনগোষ্ঠী এবং কৃষিপেশার অপার সম্ভাবনাময় দিকগুলো বলতে গেলে আঁধারে নিমজ্জিত ছিল। সে বিষয়ে নজর দিয়ে আশির দশকে বাংলাদেশের একমাত্র টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়ে আসি কৃষিভিত্তিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান, ‘মাটি ও মানুষ’। টেলিভিশন মিডিয়াকে সব সময়ই দেখা হয়েছে ‘বিনোদন-বাক্স’ হিসেবে। কিন্তু, সেই টেলিভিশনকেই ব্যবহার করি উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে। টেলিভিশনের চোখে দেখতে পাই বাংলাদেশের টেকসই অর্থনীতি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অর্থনীতি বাস্তবায়নে কাজ করে আসছি।
সম্মাননা
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সম্মানজনক পদকে। যুক্তরাষ্ট্রের আশোকা ফেলো (১৯৯২) এবং দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘একুশে পদক’ (১৯৯৫), কৃষি সাংবাদিকতার মাধ্যমে ক্ষুধার বিরুদ্ধে জয়Ñ এই ইস্যুতে ভূমিকা রাখার জন্য ১৬ অক্টোবর, ২০০৯ বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এ.এইচ.বুর্মা অ্যাওয়ার্ড, যা উন্নয়ন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পুরস্কার।
কৃষি উন্নয়ন সাংবাদিকতার গোড়াপত্তন
তিনি আরও বলেন, সত্তরের দশকে দেশে খাদ্য ঘাটতি ছিল। তখন মনে হয়েছে এ থেকে উত্তরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। তখন থেকেই উদ্যোগ নিই। শুরু হয় কৃষি উন্নয়ন সাংবাদিকতার গোড়াপত্তন। টিভির শক্তিকে কাজে লাগাই। তবে তখন কাজ করা সহজ ছিল না। কারিগরি সুবিধা ছিল না। ব্যয় ও কাজ করা ছিল কঠিন।
কৃষি ও কৃষক নিয়ে কাজের শুরুর কথা
তখন কৃষি বলতে শুধু ধান ও পাটকে বোঝাত। সেখান থেকে বের হয়ে আসতে কাজ করি। কৃষির উপখাত বের করে আনি। পুকুরে মাছ চাষ। কৃষক বলতে শুধু গ্রামের কৃষকই নয়, শহরের যুবকও কৃষির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। তিনি গ্রামে গরু, হাঁস, ছাগল, মাছ চাষ করতে পারেন। এমনকি বাড়ির ছাদেও বাগান করতে পারেন। পোলট্টি শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এর মাধ্যমে শতভাগ যুবক যুক্ত হয়েছেন।
এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। আরও এগিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে চাল রপ্তানি শুরু হয়েছে। সবজি রপ্তানি হয়। কোয়েল পাখি চাষ হচ্ছে। কৃষিতে এক ফসল থেকে রকমারিতে গিয়েছি। তবে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষি এবং কৃষক যাতে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, সে জন্য কাজ করতে হবে। এছাড়া কৃষকের স্বাস্থ্য, নগর ও গ্রামের দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং উন্নত দেশের প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কাজ করব।
পরিবর্তনের রূপকার
কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাগ্য পাল্টাবে। আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নতি লাভ করবে বাংলাদেশ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে দেশটিরÑ একজন দক্ষ মাঠ-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাংবাদিক শাইখ সিরাজ বিশ্বাস করেন এভাবেই। মাটির সন্তান, শাইখ সিরাজ মিশে গেছেন বাংলার সবুজ প্রান্তরে, নদীনালায় আর আবাদি ক্ষেতে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ের সঙ্গে লড়ে বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারবে খাদ্য নিরাপত্তা। তিনি বিশ্বাস করেন এই লক্ষ্যে তিনি পৌঁছবেন... পৌঁছবে বাংলাদেশ। কারণ তিনিই তো বাংলাদেশের ‘পরিবর্তনের রূপকার’।
কৃষি অনুষ্ঠান
প্রসঙ্গত তিনি বলেন, বর্তমানে কৃষিকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর ভেতর রয়েছে একেবারেই নতুন ভাবনার কৃষি অনুষ্ঠান এবং কার্যক্রম। ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ (বাংলাদেশের টেলিভিশন মিডিয়ায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী কৃষকদের খেলাধুলার অনুষ্ঠান বা ফার্মার্স গেম শো), ‘কৃষকের স্বাস্থ্যসেবা’ (প্রান্তিক কৃষকদের জন্য পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম), ‘কৃষি বাজেট... কৃষকের বাজেট’ (জাতীয় বাজেট পূর্ববর্তী নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কৃষকের মাঠ-সম্মেলন যা প্রচারিত হয় চ্যানেল আই-তে), ‘চ্যানেল আই কৃষি পদক’ এবং চ্যানেল আই সংবাদে প্রথমবারের মতো নিয়মিতভাবে ‘কৃষি সংবাদ’ প্রচার প্রবর্তন তার গুরুত্বপূর্ণ কাজের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও নতুন কৃষিপ্রযুক্তি প্রচারণার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কীভাবে কৃষি উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়Ñ এসবই তার কার্যক্রমের আওতাভুক্ত।
প্রসঙ্গ : জাতীয় কৃষি দিবস
কৃষকের সম্মান এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বারবার তিনি ছুটে গিয়েছেন নীতিনির্ধারণী মহলে। আর তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাবর্ষের ১ অগ্রহায়ণ তারিখটি বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় ‘জাতীয় কৃষি দিবস’ হিসেবে। এছাড়া কৃষির উপখাত, বিশেষ করে পোলট্রি, মৎস্য ও পশুসম্পদ বিকশিত হয় তার হাত ধরেই, যেসব খাত ছিল বলতে গেলে অনালোকিত। সর্বোপরি বিশ্ব তথা এশিয়ার কৃষিপ্রধান দেশগুলোর উন্নত গবেষণা, কৃষিপ্রযুক্তি এবং সফল কৃষি কার্যক্রমের চিত্র তুলে এনে তা বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
সূত্র - দৈনিক আমাদের সময়











