Thursday, October 3, 2013

ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস গাছের সংখ্যা বেড়েই চলেছে

ক্ষতিকর ইউক্যালিপ্টাস গাছের সংখ্যা বেড়েই চলেছে

বুধবার, ২৮ অগাস্ট ২০১৩, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন

হাবিবুর রহমান


পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানার রাস্তার দুই পাশে ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানো হয়েছে : নয়া দিগন্ত
ইউক্যালিপ্টাস বা আকাশমণি আমাদের সবারই অতিপরিচিত একটি বৃরে নাম। সামাজিক বনায়নের বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই গাছ আমাদের জলবায়ু, মাটি, কৃষিজমি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বর্তমানে দেশের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এই গাছের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের আশপাশেও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে এই গাছের চারা লাগানো হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা অনেকটা না জেনেই ইউক্যালিপ্টাস গাছ, কৃষিজমির পাশে, বাড়ির আঙিনায় ও রাস্তার পাশে ব্যাপকভাবে রোপণ করছেন। মূল দ্রুতবর্ধনশীল হওয়ার কারণে ইউক্যালিপ্টাস গাছের প্রতি বেশি ঝুঁকছে বলে উত্তরাঞ্চলের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন। দেশের সর্ব-উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানাসহ অন্যান্য থানার স্থানীয়রা বসতবাড়ির পাশে, পুকুরপাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জমি ও আবাদি জমির আইলে ইউক্যালিপ্টাস গাছ রোপণ করেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল আজিজ বলেন, ইউক্যালিপ্টাস গাছ আশপাশের প্রায় ১০ ফুট এলাকার পানি শোষণ করে এবং আকাশে উঠিয়ে দেয়। এই গাছ রাতদিন ২৪ ঘণ্টাই পানি শোষণ করে বাতাসে ছেড়ে দেয়। জমির আইল, কৃষিজমি ও পতিত জমিতে এই গাছ লাগানোর কোনো মানে নেই, বরং ক্ষতিকর। এই গাছের আশপাশে কোনো গাছ জন্মাতে পারে না। ইউক্যালিপ্টাস গাছ মাটি শুকিয়ে ফেলে এবং জমির উর্বরতা কমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ইউক্যালিপ্টাস অতি দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশী প্রজাতির বৃক্ষ। এটি মাটির ৫০ ফুট নিচে পর্যন্ত পানি শোষণ করে বাতাসে ছেড়ে দেয়। যে কারণে মাটিতে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়। ইউক্যালিপ্টাস গাছের শিকড় এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে এই গাছের পাশে ধানগাছ থেকে শুরু করে অন্য কোনো প্রজাতির গাছ টিকতে পারে না। এই গাছের কাঠের গুণাগুণ ভালো হয় না। এটি মাটির গুণাগুণ এবং উর্বরতা নষ্ট করে। মাটি এক সময় চুনামাটি হয়ে যায়। আর ইউক্যালিপ্টাস গাছ কেটে ফেললে মাটির উর্বরতা ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। ইউক্যালিপ্টাস গাছ বেশি পরিমাণে খাদ্য উৎপাদন করার কারণে অধিক পরিমাণে কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমন করে। কৃষিজমি ও বাড়ির আঙিনায় ইউক্যালিপ্টাস গাছ বর্জন করা উচিত। কৃষিজমি রক্ষা করতে হলে ইউক্যালিপ্টাস বর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের ভাবা উচিত, বিভিন্নভাবে কম খরচে কিভাবে বৃক্ষরোপণ করা যায়। অধিক পরিমাণে ফলদ ও বনজ বৃক্ষরোপণ করা যায়। বনায়নের জন্য দেশী ফলদ বৃক্ষ বেছে নিলে এক দিকে যেমন ফল পাওয়া যাবে অন্য দিকে মূল্যবান কাঠও পাওয়া যাবে। উদ্ভিদবিদদের মতে, ইউক্যালিপ্টাস গাছ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে দেয়, যা পানির সামান্য উৎসকেও নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ইউক্যালিপ্টাস গাছের শ্বসনে কার্বন-ডাই অক্সাইড ত্যাগের মাত্রা বেশি, যার ফলে এই গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ জন্মায় না। এই গাছে কোনো পাখি বাসা বানায় না। পানির স্তর কমানোর কারণে ইউক্যালিপ্টাস জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করছে। ইউক্যালিপ্টাস গাছের ফুলের রেণু নিঃশ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। ইউক্যালিপ্টাস গাছের পাতা মাটির জন্য তিকর। মাটিতে পড়ার পর পাতার পচনেও অপোকৃত বেশি সময় লাগে, যা মাটি ভেদ করে পানি ভূগর্ভে যেতে বাধার সৃষ্টি করে। ইউক্যালিপ্টাস বা আকাশমণির ইংরেজি নাম Auri, Ear leaf, Acacia ও বৈজ্ঞানিক নাম Acacia auriculiformis. এটি খুব দ্রুত বাড়ে। ইউক্যালিপ্টাস অন্যান্য গাছে চেয়ে বেশি খাবার খায় ও অক্সিজেন শোষণ করে এবং কার্বন-ডাই অক্সইড ত্যাগ করে, পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় কোনো পাখিও বাসা বাঁধে না। ইউক্যালিপ্টাস গাছ তিকর, এটি বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কমিয়ে ফেলছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নার্সারি চাষি ইউক্যালিপ্টাস গাছের চারা তৈরিসহ বাজারজাত অব্যাহত রেখেছে। উত্তরাঞ্চলে হাটবাজারগুলোতে অন্যান্য পণ্যের মতো নার্সারি থেকে ইউক্যালিপ্টাস গাছের চারা বিক্রি করা হয়। দেখতে খুবই স্মার্ট এবং সস্তা এই চারা। কৃষকেরা কেনাবেচা শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই গাছের চারা নিয়ে জমির আইলে, কৃষি ক্ষেতের পাশে এবং পতিত জমিতে রোপণ করছেন। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য রার জন্য পানিখেকো গাছের চারা উৎপাদন ও লাগানো বন্ধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে রোপণ বন্ধে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রার জন্য ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণের পাশাপাশি ইউক্যালিপ্টাস গাছের তিকর দিকগুলো চাষিসহ আপামর জনগণকে জানাতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর প্রাণঘাতী আঘাত হানবে।
সূত্র - দেনিক নয়াদিগন্ত।

0 comments:

Post a Comment