কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে

কৃষিই বাংলাদেশের অথনীতির মুল চালিকা শক্তি । তাই কৃষকদের ন্যায্য মুল্যে সার, ঔষধ ও উন্নতমানের বীজ প্রদান করতে হবে

কৃষিই উ্ন্নতিতেই জাতির প্রকৃত উন্নতি

জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল, তাই কৃষকদের উন্নতিই জাতির প্রকৃত উন্নতি।

কৃষকদের তাদের উৎপাদিত ফসলের উচিত মূল্য দিতে হবে

বাংলাদেশের অসহায় কৃষক শুধু কলুর বলদের মত খেটেই চলছে, কখনও বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়, তাও কখনও ন্যর্য মুল্য পায় না।

ফড়িয়া বা দালালদের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচাতে হবে

কৃষকদের বাঁচাতে হলে প্রথমতঃই কৃষকদের থেকে তাদের উৎপাদিত পন্য ন্যার্য মুল্যে সরাসরি ক্রয় করতে হবে, যেন তারা মধ্যভোগীদের দৌরাত্ব থেকে বাঁচতে পারে।

কৃষিই বাংলাদের অথনীতির প্রান ভোমরা

দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে কৃষিই ব্যপক উৎপাদনই সরকারের কোষাগার স্ফৃত করছে, বিনিময়ে কৃষকরা কিছুই পাচ্ছেনা, বরং অবহেলার স্বীকার হচ্ছে।

Saturday, March 2, 2013

বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়

বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়



বেগুনের ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে করণীয়

বেগুন বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় সবজি। ইতঃপূর্বে শুধু রবি মওসুমে চাষ হলেও এখন সারা বছরই বেগুন চাষ হয়। দেশে সবজি চাষের আওতায় যে পরিমাণ জমি রয়েছে তার ১৫ ভাগ জমিতে বেগুন চাষ হয়। বেগুন চাষের েেত্র সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিন্তা করা হয় ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ। এটি বেগুনের সর্বাধিক তিকর পোকা। এ পোকার বৈজ্ঞানিক নাম Leucinodes orbonalis,, ইংরেজিতে এই পোকা Brinjal shoot and fruit borer  নামে পরিচিত। এ পোকার আক্রমণে ত্রেবিশেষে ৮৫ ভাগ পর্যন্ত ফলনের তি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পোকার আক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শীতের শেষে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে এ পোকার আক্রমণ ব্যাপকভাবে ল করা যাচ্ছে।
তির লণ : সাধারণত চারা রোপণের চার-পাঁচ সপ্তাহ পর এ পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এ পোকার কিড়া বা লার্ভা ফল ধরার আগে কচি ডগা ও পাতার বোঁটায় ছিদ্র করে ভেতরে ঢোকে এবং সেখান থেকে খেয়ে খেয়ে বড় হতে থাকে। এতে আক্রান্ত ডগা ও পাতা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে। কিছু দিনের মধ্যে আক্রান্ত ডগাগুলো শুকিয়ে আসে এবং পাশ থেকে নতুন শাখা-প্রশাখা বের হয়। গাছে ফুল-ফল আসার পর ডগার তুলনায় ফুল ফলে এই পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ফলের গায়ে ছিদ্র হয় এবং ওই ছিদ্রপথে কিড়ার মল ও কিড়া বের হতে দেখা যায়। বেশি মাত্রায় আক্রান্ত হলে ফল পচতে থাকে এবং ঝরে পড়ে। গ্রীষ্মকালে এ পোকা বেশি সক্রিয় থাকে। সাধারণত শীতের শেষে যখন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়তে থাকে, তখন এ পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
কৃষক ভাইদের করণীয় : আমাদের দেশের কৃষক ভাইয়েরা এ পোকা দমনের জন্য অতি মাত্রায় রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কৃষক ভাইদের একটি বড় অভিযোগ হলো, তারা কীটনাশক প্রয়োগ করেও এসব পোকামাকড় দমন করতে পারছেন না, যার দরুন এক দিকে ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে, অন্য দিকে ফসল উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার সবজি ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা একটি পরিবেশবান্ধব আইপিএম প্যাকেজ প্রণয়ন করেছেন।
নিরাপদ ফসল উৎপাদনে আইপিএম প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত দমন ব্যবস্থাগুলো হলো রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার, যান্ত্রিক দমন, জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার, উপকারী পোকামাকড়ের ব্যবহার, সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি প্রভৃতি। আইপিএম ব্যবস্থাপনায় কার্যকরীভাবে তিকর পোকামাকড় দমন করা যায়।
আইপিএম প্যাকেজ
১. গাছের আক্রান্ত অংশ ধ্বংস করা : চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে প্রতি সপ্তাহে কমপে এক-দুই বার অবশ্যই সরেজমিন বেগুন তে পরিদর্শন করতে হবে। একই সাথে রোগাক্রান্ত ডগা ও ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করে জমি থেকে দূরে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এতে গাছের আক্রান্ত অংশগুলোতে বিদ্যমান পোকার কীড়া বা লার্ভাগুলো মারা যায় এবং জমিতে পোকার আক্রমণ কমে আসে।
২. সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার : বেগুনের এ পোকা দমনের জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এখন বাজারে সহজলভ্য। প্রতি ১০ বর্গমিটার এলাকার জন্য একটি ফাঁদ গাছের উচ্চতার ওপর খুঁটি দিয়ে স্থাপন করতে হবে। চারা লাগানোর ৪-৫ সপ্তাহ পর ফাঁদ স্থাপন করতে হবে এবং ৫০-৬০ দিন পর ফাঁদ পরিবর্তন করে দিতে হবে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ পুরুষ পোকাগুলোকে আকৃষ্ট করে। পরে পুরুষ পোকাগুলো আটকা পড়ে ও মারা যায়। এতে এ পোকার প্রজনন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং পোকার আক্রমণ কমে আসে। ইস্পাহানি বায়োটেকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বাজারজাত করছে। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদঢতর থেকেও কৃষকদের এই ফাঁদ সরবরাহ করা হয়।
৩. উপকারী পোকার ব্যবহার : ট্রাইকোগ্রামা (Tricogramma chilonis) ও ব্র্যাকন (Bracon habetor) নামক দু’টি উপকারী পোকা ব্যবহার করে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা যায়। ট্রাইকোগ্রামা পোকার ডিমগুলো খেয়ে ফেলে আর ব্র্যাকন পোকার লার্ভাগুলো খায়। সম্প্রতি কিছু এনজিও এবং বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কৃষকদের এ পোকাগুলো সরবারহ করছে। কৃত্তিমভাবে জমিতে এ দুটি উপকারী পোকা ছড়িয়ে দিলে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমে আসে। এ েেত্র েেত হেক্টর প্রতি ১ গ্রাম ট্রাইকোগ্রামা এবং ৮০০-১২০০টি ব্রাকন উপকারী পোকা পর্যায়ক্রমে ছাড়তে হবে।
৪। কীটনাশক ব্যবহার :  আইপিএম প্যাকেজে সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে কীটনাশক ¯েপ্র করা হয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ একই কীটনাশক ক্রমাগত ব্যবহারের কারণে এ পোকা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে অনেক কীটনাশকই কাজ করছে না। এ েেত্র ভলিউম ফেক্সি ৩০০ (Thiamethoxam + Chlorantraniliprole) প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি করে মিশিয়ে সাত দিন অন্তর অন্তর ¯েপ্র করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। অথবা প্রোকেইম ৫ প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম করে মিশিয়ে সাত দিন অন্তর অন্তর ¯েপ্র করতে হবে। তবে ল রাখতে হবে, এক সপ্তাহে ভলিউম ফেক্সি ব্যবহার করলে পরবর্তী সপ্তাহে প্রোকেইম ব্যবহার করতে হবে। এভাবে পরিবর্তন করে কীটনাশক ব্যবহার করলে কৃষকেরা ভালো সুফল পাবেন। এ ছাড়াও ট্রেসার ৪৫ (Spinosad) প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলি করে অথবা মার্শাল ২০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি করে মিশিয়ে ¯েপ্র করা যায়। খেয়াল রাখতে হবে প্রতি সপ্তাহে একবার জমি থেকে বেগুন সংগ্রহ করার পর কীটনাশক ¯েপ্র করতে হবে। এক মাস বয়স থেকে নিয়মিত কীটনাশক ¯েপ্র করলে এ পোকার আক্রমণ সফলভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিবেশবান্ধব সবজি উৎপাদনের জন্য আইপিএম প্যাকেজ একটি লাগসই প্রযুক্তি। দিন দিন দেশে এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে নানা রকম তিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ। আইপিএম-পদ্ধতি ব্যবহার করে তিকর পোকামাকড় দমন করা যায় এবং গুনগত মানসপন্ন সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। ।
লেখক :আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ,
সহকারী অধ্যাপক
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

আমের মুকুল ঝরা সমস্যা ও করণীয়

আমের মুকুল ঝরা সমস্যা ও করণীয়


আমকে ফলের রাজা বলা হয়। বাংলাদেশে আমই হচ্ছে সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল। আমের মুকুল আসা ও ফল ধরার সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাঙ্খিত ফলন পেতে এ সময় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য। আম চাষ করতে গিয়ে আমচাষিরা যেসব সমস্যায় পড়েন তার মধ্যে আমের গুটি ঝরা অন্যতম। গুটি আসার পর নানা কারণে গুটি ঝরে যায়। এসবের কারণ ও তার প্রতিকার নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো :
প্রাকৃতিক কারণ : সাধারণত আমগাছে প্রতি মুকুলে এক হাজার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকে। তার মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রতি থোকায় জাতভেদে এক থেকে ৩০টি আমের গুটি ধরতে দেখা যায়। গুটি আসার ২৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে প্রতি থোকায় মাত্র এক থেকে দু’টি গুটি থাকে। বাকি গুটি প্রাকৃতিক বা অভ্যন্তরীণ কারণে ঝরে যায়। তবে কোনো কোনো মুকুলে কদাচিৎ চার থেকে পাঁচটি আম ধরতে দেখা যায়। এ েেত্র আমের আকার ছোট হয়।
করণীয় : অতিরিক্ত গুটি ঝরে না পড়লে আমের আকার ছোট হয় এবং আমের গুণগত মান ও ফলন কমে যায়। প্রতিটি মুকুলে একটি করে গুটি থাকলে সে বছর আমের বাম্পার ফলন হয়। তবে প্রতি মুকুলে আমের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ফুল ফোটার ১০ ও ২০ দিন পর দুইবার ১০ লিটার পানিতে ছয় গ্রাম হারে বোরিক অ্যাসিড ¯েপ্র করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আবার ফুল ফোটা অবস্থায় জিবেরেলিক অ্যাসিড প্রতি লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম হারে ¯েপ্র করলে আমের গুটি ঝরা কমে যায়।
মাটিতে রসের অভাব হলে : মাটিতে রসের অভাব হলেও আমের গুটি ঝরে যায়। আমের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় মাটিতে রসের অভাব দেখা দেয়। মাটিতে রসের অভাব হলে আমের বোঁটায় তাড়াতাড়ি নির্মোচন স্তর গঠিত হয়। ফলে আমের গুটি ঝরে যায়।

করণীয় : মাটিতে রসের অভাবে আমের গুটি ঝরে গেলে গাছের চার পাশে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। আমের গুটি মটরদানার মতো হলেই প্রথমে একবার গাছের গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে। প্রথম সেচ দেয়ার পর থেকে বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত ১৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। সেচের পাশাপাশি হরমোন প্রয়োগ করেও আমের গুটি ঝরা কমানো যায়। যেমন, আমের গুটি মটরদানার মতো হলে প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া সার অথবা প্রতি ৪.৫ লিটার পানিতে দুই মিলিলিটার হারে প্লানোফিক্স হরমোন পানিতে মিশিয়ে আমের গুটিতে ¯েপ্র করলে গুটি ঝরা কমে যায়।
পোকার আক্রমণ হলে : গুটি আসার পর প্রাথমিক পর্যায়ে আমের গুটিতে হপার পোকার আক্রমণ হতে পারে। এ পোকার আক্রমণে ২০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত আমের উৎপাদন কমে যেতে পারে। মুকুল আসার সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যেতে পারে। এ পোকার পূর্ণবয়স্ক মথ ও কিড়া গুটির রস শোষণ করে খায়, ফলে আমের গুটি শুকিয়ে ঝরে যায়। মুকুল আসার পরপরই হপার পোকার আক্রমণ হতে পারে। সে েেত্র মুকুলের ফুল শুকিয়ে যায় এবং কোনো ফল ধরে না। এ পোকা যখন মুকুলের রস চুষতে থাকে তখন এদের মলদ্বার দিয়ে প্রচুর আঠালো রস নিঃসরণ হয়। এ রস মুকুলের ফুল ও পাতায় আটকে যায়। এতে শুটি মোল্ড নামে  এক প্রকার ছত্রাক জন্মে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করে পাতার উপরিভাগ ছেয়ে ফেলে। ফলে পাতা কালো দেখায়। সবুজ পাতা কালো আস্তরণে ঢাকা থাকে বিধায় সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন কমে যায়।
এ ছাড়াও আমের গুটি মার্বেল আকৃতির হলে ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হতে পারে। এ েেত্র পূর্ণবয়স্ক পোকা আমের নিচের অংশে খোসার ওপরে ডিম পাড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় এবং লার্ভা খুব ছোট বিন্দুর মতো ছিদ্র করে আমের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্রথমে শাঁস ও পরে আঁটি খাওয়া শুরু করে। পরে আক্রান্ত স্থান কালো হয়ে যায় এবং কোনো কোনো সময় আম ঝরে পড়ে।
করণীয় : আমবাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আগাছামুক্ত ও খোলামেলা অবস্থায় রাখতে হবে । মরা ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে। হপার পোকা থেকে আমের গুটি রার জন্য দুইবার কীটনাশক ¯েপ্র করতে হবে। প্রথমবার আমের মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বে এবং দ্বিতীয়বার আমের গুটি মটরদানার মতো হলে। কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে গুটিতে ¯েপ্র করতে হবে। কীটনাশকের মধ্যে সাইপরমেথ্রিন ১০ ইসি (রিপকর্ড, ফেনম, বাসাড্রিন) বা ল্যামডা সাই হ্যালাথ্রিন ২.৫ ইসি বা ফেন ভেলারেট ২০ ইসি গ্র“পের যেকোনো একটি কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে এক মিলিলিটার হারে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।  ডেল্টামেথ্রিন (ডেসিস) বা একতার ¯েপ্র করেও হপার থেকে আমের মুকুলকে রা করা যায়।
রোগের আক্রমণ হলে : সাধারণত মাঘ-ফাল্গুনে আমগাছে মুকুল-ফুল-গুটি আসে। আমের এ অবস্থায় ছত্রাকজনিত নানা রোগের আক্রমণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এসব ছত্রাকজনিত রোগের পাউডারি মিলডিউ অন্যতম। আক্রান্ত অংশে পাউডারের গুঁড়ার মতো একপ্রকার জিনিস দেখা যায়। রোগের ব্যাপক অবস্থায় আক্রান্ত অংশ সাদা পাউডারে মুকুল ঢেকে যায় এবং আমের গুটি ঝরে পড়ে। এ ছাড়াও অ্যানথ্রাকনোজ রোগের কারণেও আমের গুটি ঝরে যেতে পারে। মুকুল বা ফুল এ রোগে আক্রান্ত হলে তা কালো হয়ে ঝরে পড়ে। গুটি বা ছোট অবস্থায় আক্রান্ত হলে আমের গায়ে ধূসর বাদামি বা কালো দাগ পড়ে। বেশি আক্রান্ত হলে এগুলোও ঝরে পড়ে। আমের মুকুলে এ রোগের আক্রমণ হলে গাছের সব মুকুল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
করণীয় : পাওডারি মিলডিও রোগের জন্য ফুল আসার আগে একবার এবং ফুল ধরার পর একবার সালফারজাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন কুমুলাস, ম্যাকসালফার, থিওভিট, রনভিট দুই গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হয়। অ্যানথ্রাকনোজ রোগের েেত্র প্রতি লিটার পানিতে এক মিলি প্রোপিকনাজল (টিল্ট) বা এক গ্রাম কার্বেন্ডাজিম (ব্যাভিস্টিন) বা দুই গ্রাম ডাইথেন এম৪৫ মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
আম পূর্ণাঙ্গ ফলে রূপ নেয় কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে। প্রথমে মুকুল, মুকুল থেকে ফুল, ফুল থেকে গুটি এবং গুটি বড় হয়ে আম ফলে রূপ নেয়। প্রতিটি পর্যায়েই আমগাছের বালাই ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তবে মুকুল আসার আগে এবং পরে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কেননা, মকুল ঝরে পড়েই আমের উৎপাদন বহুলাংশে হ্রাস পায়।
লণীয় বিষয় : কৃষকদের মনে রাখতে হবে যে, গাছে মুকুল আসার আগে যেমন ¯েপ্র করার প্রয়োজন নেই তেমনি মকুল ফোটা অবস্থায় কোনোভাবেই ¯েপ্র করা ঠিক নয়। এ সময় প্রচুরসংখ্যক উপকারী পোকা আমবাগানে আসে এবং পরাগায়ণে সহযোগিতা করে। মনে রাখতে হবেÑ গাছে মুকুল আসার পর সঠিকভাবে দুইবার ¯েপ্র করতে পারলে গাছে প্রচুর আম থাকবে। ।
লেখক ঃ - আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ, লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
দৈনিক নয়াদিগন্ত, তারিখ: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

Friday, March 1, 2013

গমের ভালো উত্পাদন পেতে করণীয়...


গমের ভালো উত্পাদন পেতে করণীয়...


গম অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। গম থেকে পাওয়া প্রতি ১০০ গ্রাম আটায় আমিষ ১২ দশমিক ১ গ্রাম, শর্করা ৬৯ দশমিক ৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪৮ মিলিগ্রাম, লৌহ ১১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ২৯ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি-১০ দশমিক ৪৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২০ দশমিক ২৯ মিলিগ্রাম, আঁশ ১ দশমিক ৯ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ২ দশমিক ৭ গ্রাম এবং জলীয় অংশ থাকে ১২ দশমিক ২ গ্রাম। গম সাধারণত মানুষের রুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া গমের কুঁড়া গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কার্তিক মাসের শেষ থেকে অগ্রহায়ণ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ অর্থাত্ নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত উচ্চ ফলনশীল জাতের গমের বীজ বপন করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গমের শীষ বের হয়েছে। কিছুদিন পর গম সংগ্রহ করা হবে। এই মুহূর্তে গম ক্ষেতের বিশেষ যত্ন নেয়া প্রয়োজন। তাহলে সঠিক পরিমাণে গমের উত্পাদন হবে। অন্যথায় ফসল উত্পাদন কমে যেতে পারে।
সেচ ও আগাছা পরিষ্কার : মাটির প্রকার ভেদে সাধারণত ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ চারার তিন পাতার সময় (বপনের ১৭-২১ দিন পরে), দ্বিতীয় সেচ গমের শীষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৫৫-৬০ দিন পর)। তৃতীয় সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫-৮০ দিন পর) দিতে হবে। জমিতে আগাছা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে আগাছা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
পোকা-মাকড় ও রো ব্যবস্থাপনা : গামের পাতায় পাকসিনিয়া রিকন্ডিটা নামক ছত্রাকের আক্রমণ হতে পারে। প্রথমে পাতার উপর ছোট গোলাকার হলুদাভ দাগ পড়ে। শেষ পর্যায়ে এই দাগ মরিচার মতো বাদামি বা কালচে রংয়ে পরিণত হয়। হাত দিয়ে আক্রান্ত পাতা ঘষা দিলে লালচে মরিচার মতো গুঁড়া হাতে লাগে। এ রোগের লক্ষণ প্রথমে নিচের পাতায়, তারপর সব পাতায় ও কাণ্ডে দেখা যায়। দেশের উত্তরাঞ্চলে এ রোগ বেশি হয়ে থাকে। এ রোগ থেকে প্রতিকার পেতে রোগ প্রতিরোধী গমের জাত কাঞ্চন, আকবর, অঘ্রাণী, প্রতিভা, সৌরভ ও গৌরবের চাষ করতে হবে। সুষম হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। টিল্ট ২৫০ ইসি ছত্রাকনাশক (০.০৪%) ১ মিলি আড়াই লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
পাতার দাগ রোগ দমন : বাইপোরারিস সরোকিনিয়ানা নামক ছত্রাক এ রোগ ঘটায়। গাছ মাটির উপর এলে প্রথমে নিচের পাতাতে ছোট ছোট বাদামি ডিম্বাকার দাগ পড়ে। পরবর্তী সময়ে দাগসমূহ আকারে বাড়তে থাকে এবং গমের পাতা ঝলসে দেয়। রোগের জীবাণু বীজে কিংবা ফসলের পরিত্যক্ত অংশে বেঁচে থাকে। বাতাসের অধিক আদ্রতা এবং উচ্চ তাপমাত্রা (২৫ ডিগ্রি সে.) এ রোগ বিস্তারের জন্য সহায়ক। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে—রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রতি কেজি গম বীজে ২.৫-৩.০ গ্রাম ভিটাভেক্স-২০০ মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। টিল্ট-২৫০ ইসি (০.০৪%) এক মিলি প্রতি আড়াই লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
গমের গোড়া পচা রোগ দমন : স্কেলেরোশিয়াম রলফসি নামক ছত্রাক দ্বারা গমের এ রোগ হয়। এই রোগের ফলে মাটির সমতলে গাছের গোড়ায় হলদে দাগ দেখা যায়। পরে তা গাঢ় বাদামি বর্ণ ধারণ করে এবং আক্রান্ত স্থানের চারদিক ঘিরে ফেলে। পরবর্তী সময়ে পাতা শুকিয়ে গাছ মারা যায়। রোগের জীবাণু মাটিতে কিংবা ফসলের পরিত্যক্ত অংশে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। সাধারণত বৃষ্টির পানি, সেচের পানি দ্বারা এক জমি থেকে অন্য জমিতে বিস্তার লাভ করে। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে—রোগ প্রতিরোধী কাঞ্চন, আকবর, অঘ্রাণী, প্রতিভা, সৌরভ ও গৌরব জাতের চাষ করতে হবে। মাটিতে সব সময় পরিমিত আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। ভিটাভেক্স-২০০ নামক ওষুধ প্রতি কেজি বীজে ২.৫-৩.০ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
গমের আলগা ঝুল রোগ দমন : আসটিলেগো ট্রিটিসি নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। গমের শীষ বের হওয়ার সময় এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। ওই ছত্রাকের আক্রমণের ফলে গমের শীষ প্রথমদিকে পাতলা পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে। পরে তা ফেটে যায় এবং দেখতে কালো ঝুলের মতো দেখায়। ছত্রাকের বীজকণা সহজে বাতাসের মাধ্যমে অন্যান্য গাছে এবং অন্য জমির গম গাছে সংক্রমিত হয়। রোগের জীবাণু বীজের ভ্রূণে জীবিত থাকে। পরবর্তী বছর আক্রান্ত বীজ জমিতে বুনলে বীজের অংকুরোদগমের সময় জীবাণুও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে—রোগ প্রতিরোধী কাঞ্চন, আকবর, অঘ্রাণী, প্রতিভা, সৌরভ ও গৌরব জাতের চাষ করতে হবে। রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। ভিটাভেক্স-২০০ ওষুধ প্রতি কেজি বীজে ২.৫-৩.০ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
গম বীজের কালো দাগ রোগ দমন : ডেক্সলেরা প্রজাতির ও অলটারনারিয়া প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা গমের এ রোগ হয়। এ রোগের ফলে গমের খোসায় বিভিন্ন আকারের বাদামি অথবা কালো দাগ পড়ে। বীজের ভ্রূণে দাগ পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে দাগ সম্পূর্ণ বীজে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের জীবাণু বীজের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে থাকে। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে—সুস্থ বীজ সংগ্রহ করে বপন করতে হবে। ভিটাভেক্স-২০০ নামক ওষুধ প্রতি কেজি বীজে ২.৫-৩.০ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ : চৈত্র মাসের প্রথম থেকে মধ্য-চৈত্র (মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম) পর্যন্ত কেটে গম সংগ্রহ করতে হয়।
 দৈনিক আমাদের দেশ, সূত্র : কৃষি তথ্য সার্ভিস

এ সময়ের ফল-ফসলের রোগবালাই ও করণীয়


এ সময়ের ফল-ফসলের রোগবালাই ও করণীয়

এ বছর কাঁঠালের মুছি এসেছে প্রচুর। কিন্তু সঠিক রোগ দমনের অভাবে কাঁঠালের
ফলন ভালো হয় না। এছাড়াও কুমড়াজাতীয় সবজি, সরিষা এবং পেঁয়াজ চাষেও নানান রোগবালাই দেখা দেয়। এসব রোগের দমন এবং করণীয় নিয়েই
এই বিশেষ ফিচারটি লিখেছেন আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ


কাঁঠালের মুচি পচা রোগে করণীয়
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান দফতরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে কাঁঠাল চাষ হয় প্রায় ১০ হাজার হেক্টরে আর বার্ষিক উৎপাদন প্রায় সোয়া লাখ মেট্রিক টন। অন্য দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে ২৬ হাজার হেক্টরে কাঁঠাল চাষ হয় আর তাতে ফলন হয় দুই লাখ ষাট হাজার মেট্রিক টন। প্রাপ্ত তথ্যদ্বয়ের মাঝে ফারাক থাকলেও দেশের সর্বত্র প্রতিটি বাড়িতে কয়েকটি করে কাঁঠালগাছ রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কাঁঠালের রোগের মধ্যে মুছি পচা ও কাঁঠাল পচা রোগই প্রধান। জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারি মাসে দেশের সর্বত্র কাঁঠালে মুছি পচা রোগ দেখা দেয়। প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ ফলন নষ্ট হয় কাঁঠালের মুছি পচা রোগের কারণে।
লণ : রাইজোপাস আরটোকারপি নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়। মওসুমের শুরুতে গাছে কাঁঠালের মুছিতে পচন ধরে। সাধারনত মুছির বোঁটা থেকে পচন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ মুছিতে বিস্তৃত হয়। এ সময় মুছির ওপর মাকড়সার জালের মতো ছত্রাকের মাইসেলিয়াম দেখা যায়। সবশেষে মুছি পচে গাছ থেকে ঝরে পড়ে। অনেক সময় এ রোগ পূর্ণাঙ্গ কাঁঠালেও পরিলতি হয়। এতে কাঁঠালে পচন ধরে। কাঁঠাল সংগ্রহোত্তর কাঁঠাল পচা রোগের আক্রমণের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। যদি কাঁঠালগাছের আশপাশে গোবর বা কম্পোস্টের স্তূপ থাকে বা ডাস্টবিন থাকে অথবা ময়লা আবর্জনার স্তূপ থাকে সে েেত্র এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। কারণ ছত্রাকের জন্য এসব জায়গা উত্তম আশ্রয়স্থল।
করণীয় : গাছে মুছি আসার আগে গাছের কাণ্ডের ডালপালা হালকা ছেঁটে দিতে হবে। আক্রান্ত মুছি ছিঁড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রমণ দেখা দিলে ২ গ্রাম ডাইথেন এম ৪৫ বা ০.৫ মিলি রিডোমিল গোল্ড প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ ঘন্টা অন্তর দুইবার স্প্রে করতে হবে। কাঁঠালগাছের আশপাশে গোবর, কম্পোস্টের স্তূপ, ডাস্টবিন বা ময়লা আবর্জনার স্তূপ থাকলে তা অবশ্য অপসারণ করতে হবে। এতে মুছি এবং কাঁঠাল পচা রোগ দুটোই কমে যাবে।
কুমড়াজাতীয় ফসলের পাউডারি মিলডিও রোগে করণীয়
মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লাউ, তরমুজ, শসা, ীরাসহ সব ধরনের কুমড়াজাতীয় ফসলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চরাঞ্চলে কুমড়া ফসলে ব্যপকভাবে এ রোগের আক্রমণ ল করা যাচ্ছে।
লণ : Erysiphe নামক এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। গাছের বয়স্ক পাতায় রোগের প্রকোপ বেশি হয়। পাতার উপরিভাগ সাদা পাউডার দিয়ে ভরে যায়। এসব পাতা পরে হলদে হয়ে যায়। মারত্মক আক্রমণের েেত্র গাছের পাতা শুকিয়ে যায় ও ঝরে পড়ে। গাছের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হওয়ায় ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। ফলের আকার ছোট ও বিকৃত হয়। সাধারণত রোগের জীবাণুগুলো বাতাসের মাধ্যমে উড়ে নতুন গাছকে আক্রমণ করে। দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বেশি হলে অর্থাৎ রাতের তাপমাত্রা ১০ডি. সে. এবং দিনের তাপমাত্র ২৫-৩০ডি. সেলসিয়াস হলে রোগের প্রকোপ বাড়ে।
করণীয় : গাছের আক্রান্ত অংশগুলো সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। পানি দিয়ে আক্রান্ত গাছ ধুয়ে দিলে রোগের প্রকোপ কমে আসে। কারণ জীবাণগুলো জীবিত গাছ ছাড়া বাঁচতে পারে না। পানি দিয়ে আক্রান্ত গাছ ধুয়ে দিলে জীবাণগুলো মাটিতে পড়ে মারা যায়। সালফার-জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করে এ রোগকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সালফোটক্স ৮০ ডব্লিউপি ০.৪ শতাংশ হারে (১০ লিটার পানিতে ৪০ গ্রাম সালফোটক্স মিশিয়ে) অথবা থিওভিট ৮০ ডব্লিউপি ০.২ শতাংশ হারে অথবা ম্যাকসালফার ৮০ ডব্লিউপি ০.২ শতাংশ হারে রোগ দেখা দেয়ার পর ৭-১০ দিন অন্তর দুইবার স্প্রে করতে হবে। সাধারণত ফসল মওসুমে এক থেকে দুইবার ওপরের ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে রোগের আক্রমণ হয় না।
পেঁয়াজের ব্লচ রোগে করণীয়
এ রোগটি বাংলাদেশে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত। পেঁয়াজে দুই ধরনের ব্লচ রোগ দেখা যায়। একটি হলো পার্পল ব্লচ অন্যটি হ্য়োাইট ব্লচ। কখনো কখনো দু’টি রোগ একই সাথে থাকতে পারে। পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের েেত্র এ রোগটি দমনে প্রতিরোধব্যবস্থা নিতে হয়।
লণ : Alternaria porri নামক ছত্রাকের আক্রমণে পার্পল ব্লচ এবং Stemphylium নামক ছত্রাকের আক্রমণে হোয়াইট ব্লচ রোগ হয়। রোগটি পেঁয়াজের পাতা ও পুষ্পদণ্ডে দেখা দেয়। আক্রান্ত অংশে প্রথমে ুদ্র পানিভেজা বাদামি দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে দাগটি বাড়তে থাকে। পূর্ণাঙ্গ দাগে কয়েকটি চক্র পরিলতি হয়। পার্পল ব্লচ রোগের েেত্র পূর্ণাঙ্গ দাগটি পার্পল বা বেগুনি রঙ ধারণ করে আর হোয়াইট ব্লচের েেত্র দাগটি সাদা বর্ণের হয়। কখনো কখনো দুটি রোগই একসাথে থাকতে পারে। এ েেত্র সাধারণত প্রথমে হোয়াইট ব্লচ এবং পরে পার্পল ব্লচ দেখা দেয়। পেঁয়াজের পাতার েেত্র পাতার শীর্ষ থেকে আক্রমণ শুরু হয়। ধীরে ধীরে নিচের দিকে আক্রমণ বিস্তৃত হয় এবং সম্পূর্ণ পাতা শুকিয়ে যায়। পুষ্পদণ্ডের যেকোনো জায়গায়ই আক্রমণ হতে পারে। আক্রান্ত পুষ্পদণ্ড ভেঙে যায়। ফলে বীজ অপুষ্ট থাকে।
করণীয় : আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগটি বীজবাহিত বিধায় রোভরাল বা প্রোভেক্স ২০০ দ্বারা ০.৩ শতাংশ হারে বীজ শোধন করে লাগাতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রোভরাল এবং ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বীজ উৎপাদনের জন্য পেঁয়াজ চাষ করলে প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে পুষ্পদণ্ড আসার পর প্রতি সপ্তাহে একবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।
 সরিষার পাতা ঝলসানো রোগে করণীয়
সরিষা বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল। লাভজনক বিধায় দিন দিন বাংলাদেশে সরিষা চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। চলতি মওসুমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরিষাগাছের পাতায় দাগ ও ঝলসানো রোগ ল করা গেছে। সাধারণত আগাম চাষে রোগের আক্রমণ কম হয়।
লণ : Alternaria brassicae নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগটি হয়। গাছের নিচের বয়ষ্ক পাতায় এ রোগটি প্রথম দেখা দেয়। পাতায় কালচে রঙের দাগ পড়ে। ধীরে ধীরে দাগ বড় হতে থাকে। পূর্ণাঙ্গ দাগে কয়েকটি চক্র পরিলতি হয়। অনেক দাগ একত্র হয়ে সম্পূর্ণ পাতাকে ঝলসে দেয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে রোগটি দ্রুত গাছের কাণ্ড, পত্রবৃন্ত ও ফলের বেটায় ছড়িয়ে পড়ে।
করণীয় : আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোগটি বীজবাহিত বিধায় রোভরাল বা প্রোভেক্স ২০০ দ্বারা ০.৩ শতাংশ হারে বীজ শোধন করে লাগাতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ¯েপ্র করতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে প্রতি লিটার পাণিতে ২ গ্রাম রোভরাল এবং ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড একত্রে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এছাড়াও ডানথেন এম ৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ¯েপ্র করা যেতে পারে।
আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ : সহকারী অধ্যাপক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
তারিখ: ২ মার্চ, ২০১

মাশরুম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে



জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাভারের মাশরুম



জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে মাশরুম। পুষ্টি ও ঔষধিগুণ থাকায় বিভিন্ন আঙ্গিকে খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে এই সবজি। খুব সহজেই এটি চাষ করা যায় বলে এর উৎপাদনও বাড়ছে। মাশরুম চাষের লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ দেশব্যাপী এর ব্যবহার বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে সাভারের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র।
বাংলাদেশে মাশরুম চাষের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। স্বল্প পরিসরে তিন দশক আগে এই সবজির চাষ শুরু হয়। জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে তৎকালীন কৃষি উপদেষ্টা মরহুম আজিজুল হক থাইল্যান্ড থেকে সর্বপ্রথম স্ট্র মাশরুমের বীজ এ দেশে নিয়ে আসেন। রাজধানীর আসাদ গেটসংলগ্ন উদ্যান নার্সারিতে ওই বীজ দিয়ে মাশরুম চাষের সূচনা হয়।
পরে ১৯৮০ সালের দিকে জাপান ওভারসিজ কো-অপারেটিভ ভলান্টিয়ারের সদস্য জাপানের মাশরুম বিশেষজ্ঞ নাকানোর নেতৃত্বে প্রাতিষ্ঠানিক ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে মাশরুমের স্পন উৎপাদন ও মাশরুম চাষের কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি পরে ল্যাবের বেশ কিছু উন্নয়নকাজও করে। সাভারে স্থাপিত সোবহানবাগ হর্টিকালচার নামে এই ল্যাবরেটরি ১৯৮৫ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। পর্যায়ক্রমে এখানে জাপানের মাশরুম বিশেষজ্ঞরা এসে মাশরুমচাষি, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও মাশরুম শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রশিণ দেন। এ ছাড়া সভা-সেমিনারসহ বিভিন্নভাবে মাশরুম সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। পরে এ সবজির প্রসারের ল্েয মাশরুম চাষ কেন্দ্রকে জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
মাশরুম চাষ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১৬টি হর্টিকালচার সেন্টারে মাশরুম সাব-সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জনপ্রিয় মাশরুমের ১১৬টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশে ৩৫০ জন বেসরকারি মাশরুম বীজ উৎপাদক বীজ উৎপাদনে সক্রিয় আছেন। এ ছাড়া ১৫টি মাশরুমভিত্তিক খাদ্যশিল্প ও একটি ওষুধ শিল্প গড়ে উঠেছে। আর মাশরুম চাষে সরাসরি সম্পৃক্ত আছেন লাধিক মানুষ।
জাতীয় মাশরুম সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রের স্ট্রেনদিং মাশরুম ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক ড. নিরদচন্দ্র সরকার জানান, এই প্রতিষ্ঠান দেশী-বিদেশী জাতের মাশরুমের দেশোপযোগী গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রশিণের মাধ্যমে দ জনশক্তি তৈরি, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও বেকার সমস্যার সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা সৃষ্টি করাসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টিতে সহায়তার উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, পুষ্টি ও ওষুধ গুণসম্পন্ন মাশরুম পুষ্টিকর ও সুস্বাদু সবজি। এতে শর্করা ও চর্বির পরিমাণ খুব কম এবং মানুষের দেহের প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ বেশি, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মাশরুম ব্যবহারে দেহের রোগ প্রতিরোধ মতাও বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ভাইরাসজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করে।
দেশে দিন দিন মাশরুমের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকেও মাশরুম আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে দেশে মাশরুমের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন মাশরুম চাষি। তাদের মতে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ বাড়ালে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। এ েেত্র সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরো জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
রুপোকুর রহমান
তারিখ: ২ মার্চ, ২০১৩ ।   সূত্র: বাসস