কাঁঠালের ঝরে পড়া প্রতিরোধে করণীয়
পৃথিবীর ফলগুলোর মধ্যে কাঁঠাল আকারে বৃহত্তম
এবং বাংলাদেশে এটি জাতীয় ফল। কাঁঠালের মতো এত বেশি পুষ্টি উপাদান অন্য কোনো ফলে
পাওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, এটি এমন একটি ফল, যার কোনো অংশই ফেলে
দিতে হয় না (কোষ ও বীজ মানুষের খাদ্য ও বাকি অংশ পশুখাদ্য)। বাংলাদেশে উৎপাদনের
দিক থেকে কলার পরেই কাঁঠালের স্থান। এ দেশে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে
কাঁঠাল উৎপাদন হয়, যার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ টন। এ ফল দামে অন্য ফলের তুলনায় কম
হওয়ায় গরিব মানুষ সহজে খেতে পারেন। তাই কাঁঠালকে গরিবের ফলও বলা হয়। এ ফল কাঁচা
ও পাকা উভয় অবস্থায় খাওয়া যায়। সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে (পাকার আগ
পর্যন্ত) কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া যায়।
ফল না ধরা এবং ঝরে পড়ার কারণ
১. গাছের শারীরিক অবস্থা দুর্বল হলে; ২.
মানুষের চলাফেরা এবং গাছের গোড়ায় গরু-মহিষ বাঁধার ফলে গাছের গোড়ার মাটি শক্ত
হয়ে গেলে; ৩. কাঁঠালগাছে অনেক সময় অত্যধিক তেজ বা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেলে সে
ক্ষেত্রে ফুল ও ফল ধরবে না; ৪. ছোট গাছে ফুল ধরার প্রথমপর্যায়ে কাঁঠালগাছে
সাধারণত পুরুষ ফুল উৎপাদন করে থাকে, এ জন্য প্রথম এক-দুই বছর ফল হয় না বা হলেও
সামান্য; ৫. পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের বয়সের পার্থক্য বেশি হলে ফল ঝরে পড়ে; ৬.
অতিরিক্ত খরা হলে; ৭. অপুষ্টির কারণে ফল ঝরে পড়ে; ৮. মাটিতে কোনো সমস্যা থাকলে
(যেমনÑ লবণাক্ততা, বেশি এসিড বা ক্ষার প্রভৃতি); ৯. রোগ দ্বারা আক্রান্ত হলে; ১০.
পোকা-মাকড় দ্বারা আক্রান্ত হলে ফল ঝরে পড়ে।
প্রতি বছর সঠিক পরিচর্যার অভাব এবং রোগ ও পোকার
কারণে অনেক ফলন কমে যায়। তাই সঠিক পরিচর্যা এবং রোগ ও পোকা-মাকড় দমন করে
বাংলাদেশের জাতীয় ফলের ফলন বৃদ্ধির জন্য পরামর্শ দেয়া হলোÑ
সঠিক পরিচর্যা : ১. সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।
একটি ১০-১৫ বছরের গাছে গোবর ৬০-৮০ কেজি, ইউরিয়া ১-১.২০ কেজি, টিএসপি ০.৮০-১.০
কেজি, এম পি এক কেজি। সার তিন ভাগে ভাগ করে (গাছের বয়স ৫-১০ বছর হলে এর অর্ধেক
এবং ১৬ বছরের বেশি হলে দেড় গুণ সার প্রয়োগ করতে হবে) প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে
একবার, বর্ষার আগে একবার ও বর্ষার পরে একবার প্রয়োগ করতে হবে; ২. খরা মওসুমে যখন
আকাশ দীর্ঘ দিন বৃষ্টিপাতহীন থাকে এবং মাটিতে রসের অভাব হয়, তখন কাঁঠালগাছের
গোড়ায় যেকোনো পদ্ধতিতে সেচ দিতে হবে। বিশেষ করে বসন্তকালে যখন কাঁঠালগাছে মুচি
ছোট থাকে, তখন সেচ প্রয়োগ না করলে রসের অভাবে ফল ঝরে যেতে পারে বা আকারে
ছোট হয়ে যায়। তাই খরা মওসুমে ১৫-২০ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে
যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়; ৩. গাছের গোড়ায় গরু-মহিষ বাঁধা যাবে না বা মানুষ
চলাচলের পথ রাখা যাবে না; ৪. গাছের গোড়া আগাছামুক্ত রাখতে হবে এবং মাটি কুপিয়ে
রাখতে হবে; ৫. অত্যধিক তেজ হলে কিছু ডালপালা কেটে দিতে হবে; ৬. কৃত্রিম পরাগায়নের
মাধ্যমে (পুরুষ ফুল ছিঁড়ে সকালে স্ত্রী ফুলে স্পর্শ করতে হবে) ফল ঝরা রোধ করা
যেতে পারে।
রোগ দমন
ফল পচা রোগ : কাঁঠালে যেসব রোগ দেখা যায়, তার
মধ্যে প্রায় ৮০ ্র্রশতাংশ রোগ হলো ফল পচা রোগ। এ রোগ রাইজোপাস এট্রোকারপি নামক এক
প্রকার ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।
লক্ষণগুলো : ১. রোগের প্যাথোজেন প্রথমে
পুষ্পমঞ্জরিতে আক্রমণ করে; ২. অপরিপক্ব ফলে পানি ভেজা দাগ পড়ে; ৩. আক্রান্ত ফল
সাদা মাইসেলিয়াম দ্বারা আবৃত হয় এবং পরে ফল কালো বর্ণ ধারণ করে; ৪. আক্রান্ত ফল
কুচকে যায় এবং ঝরে পড়ে।
দমনব্যবস্থা : ক. আক্রান্ত পুষ্প, ফল সংগ্রহ
করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে; খ. বাগান পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখতে হবে; গ. ফুল ফোটার সময়
ডায়াথিন-এম-৪৫ বা নোয়িন ছত্রাক নাশক ০.৩ শতাংশ হারে ১০-১৫ দিন পরপর দুই-তিনবার
¯েপ্র করতে হবে; ঘ. ফলে এ রোগ দেখা গেলে ০.২ শতাংশ হারে রোভরাল ¯েপ্র করতে হবে।
পোকা দমন
ফলের মাজরা পোকা : এ পোকা কাঁঠালের ব্যাপক
ক্ষতি করে থাকে। এর কারণে ফলন শূন্যে কাছাকাছি আসতে পারে।
লক্ষণগুলো : ১. কুঁড়ি, মুচি, ছোট ফল এদের
দ্বারা আক্রান্ত হয়; ২. এ পোকার কীরা ফল ছিদ্র করে ভেতরে প্রবেশ করে খেয়ে নষ্ট
করে; ৩. আক্রান্ত স্থানে পানি ভেজা দাগ দেখা যায় ও পচন শুরু হয়; ৪. আক্রান্ত ফল
কালো হয়ে কুঁচকে যায় এবং ঝরে পড়ে।
বিটল ও কাণ্ডের মাজরা পোকা
লক্ষণগুলো : ১. কুঁড়ি, বিটপ, কাণ্ড, মাটির
ওপরে মূল প্রভৃতি স্থানে এ পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়। পোকার কীরা এসবের মধ্যে
প্রবেশ করে কলা খেয়ে নষ্ট করে ফেলে; ২. এ পোকার অন্যতম লক্ষণ হলো যেখানে ছিদ্র
করে সেখানে গর্তের মুখে এদের বিষ্ঠা ঝুলতে থাকে; ৩. গাছের যে অংশে আক্রমণ করে সে
অংশ দুর্বল হয়ে যায় বা মরে যায়।
দমনব্যবস্থা : ক. গর্তে শিক ঢুকিয়ে পোকা মারতে
হবে; খ. কাদা বা মোম দিয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে; ৩. ডায়াজিনন ৫০ ইসি বা
ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি ০.২ শতাংশ হারে পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে এ রোগ দমন করা
সম্ভব। লেখক : পিএইচডি গবেষক, রাবি
কৃষিবিদ এম এ মজিদ, তারিখ: ১৬ মার্চ, ২০১৩ Daily Nayadiganto.
কৃষিবিদ এম এ মজিদ, তারিখ: ১৬ মার্চ, ২০১৩ Daily Nayadiganto.







0 comments:
Post a Comment