Tuesday, October 1, 2013

সাশ্রয়ী : পরিবেশের ক্ষতি করে না হচ্ছে জনপ্রিয়

সাশ্রয়ী : পরিবেশের ক্ষতি করে না হচ্ছে জনপ্রিয়
সৈয়দপুর (নীলফামারী) থেকে নজির হোসেন নজু : সৈয়দপুরে আমন ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে কৃষিবান্ধব পার্চিং পদ্ধতিতে কৃষকরা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে।  তবে লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে কৃষকদের মাঝে। কারণ এ পদ্ধতি প্রয়োগে যেমন ধৈঞ্চে গাছের ঝরে পড়া পাতা থেকে ক্ষেতে তৈরি হচ্ছে জৈব সার পাশপাশি ক্ষেতের পোকা দমনে কৃষকদের অর্থও সাশ্রয় হচ্ছে। তাই গোটা উপজেলার আমন ক্ষেতে ক্ষেতে বর্তমানে পার্চিং পদ্ধতি ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে ।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আমন ক্ষেতে মাজরা, পাতামোড়ানো, ঘাসফড়িং, চুঙ্গি, লেদাপোকা প্রভূতি নানা ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করে। ক্ষেতে আক্রান্ত পোকামাকড় দমনে কৃষকরা বাজার থেকে চড়ামূল্যে রাসায়নিক কীটনাশক সংগ্রহ করে আমন ক্ষেতে প্রয়োগ করছে। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মূখীন হচ্ছে কৃষকরা। তবে আমন ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগের পরিবর্তে পার্চিং পদ্ধতি প্রতি কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে কৃষি বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। কৃষি বিভাগ সূত্র জানায় ক্ষেতের পোকামাকড় দমনের এই কৃষিবান্ধব একটি পদ্ধতি হচ্ছে পার্চিং। পোকামাকড় দমনে মূলতঃ দু’ধরনের পার্চিং পদ্ধতি রয়েছে। এর একটি হচ্ছে “লাইভ পার্চিং” ক্ষেতে ধৈঞ্চে গাছ লাগানো। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম সেচবানিয়া রোস্টট্রাটা। এটির আফ্রিকান জাত। অপর পদ্ধতিটি হচ্ছে ডেড পার্চিং অর্থাৎ ফসলের ক্ষেতে গাছের ডাল কিংবা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দেয়া।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, সাধারণত আমনের বীজ বপনের সময় আমন বীজের সঙ্গে এ ধৈঞ্চে গাছের বীজও আমন বীজতলায় বপন করা হয়। আমন চারার সঙ্গে সঙ্গে এটিও যথাযথভাবে বেড়ে উঠে। এরপর জমিতে আমন বীজ রোপনের ৫/১০দিনের মধ্যে আমন ক্ষেতে ধৈঞ্চে গাছ রোপন করতে হয়। তবে আমন বীজতলা থেকে তোলা একটি ধৈঞ্চে গাছ ২/৩টি অংশে কেটে আমন ক্ষেতে রোপন করা হয়। আমন ধান গাছ বেড়ে উঠার সাথে সাথে এ গাছগুলোও বেড়ে উঠে। পরবর্তীতে এ ধৈঞ্চে গাছগুলো যখন আমন গাছের উচ্চতাকে অতিক্রম করে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে বেড়ে উঠে, তখন এসব ধৈঞ্চে গাছে বসে পাখি। আর ওই পাখি আমন ক্ষেতে উড়ে উড়ে পোকামাকড় ধরে খায়। তাছাড়া ধৈঞ্চে গাছের পাতা আমন ক্ষেতের জমিতে ঝরে পড়ে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে জৈব সার। এতে করে লাইভ পার্চিং পদ্ধতির কারণে একদিকে আমন ক্ষেতে আক্রান্ত পোকামাকড় দমনে ক্ষেতে কৃষকদের রাসায়নিক কীটনাশক ছিটাতে হয় না। অন্যদিকে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করাও প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে আমন চাষাবাদে কৃষকদের অর্থনৈতিক দিকে থেকেও সাশ্রয় হচ্ছে। কারণ রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করতে তাদের অনেক অর্থ ব্যয় হতো। তাই কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার সৈয়দপুর উপজেলায় বিভিন্ন কৃষি ব্লকে কীটনাশক দমনে কৃষিবান্ধব লাইভ পার্চিং ও ডেড পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন কৃষকরা। সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা (এসএপিপিও) জানান, এবারে উপজেলার ১৪টি কৃষি ব্লকে ৪ হাজার ৫শ’হেক্টরে লাইভ পার্চিং এবং ২হাজার ৬শ’ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং লাগানো হয়েছে। তবে চলতি আমন মৌসুমে উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ও পৌরসভা কৃষি ব্লকের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি আমন ক্ষেতে লাইভ পার্চিং এবং ডেড পার্চিং পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। আর কৃষি বিভাগ লাইভ পার্চিংয়ের জন্য ধৈঞ্চের বীজ বিনামূলে সরবরাহ করছে কৃষকদের। সৈয়দপুর পৌরসভার কয়া কৃষি ব্লকের কৃষক আব্দুর রহিম জানান, তিনি এ বছর ৩ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করেছেন। প্রতি বছরই আমন ক্ষেত বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রান্ত হয়। তখন ক্ষেতের পোকা দমনে রাসায়নিক সার প্রয়োগে তাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হতো। কিন্তু এবারে লাইভ পার্চিং পদ্ধতি অর্থাৎ ধৈঞ্চে গাছ লাগানোর ফলে তেমন একটা পোকামাকড়ের আক্রমন হয়নি আমন ক্ষেতে। ধৈঞ্চে গাছে বসে পাখিরা সব পোকামাকড় খেয়ে ফেলছে। ফলে কৃষিবান্ধব এ পদ্ধতি প্রয়োগে তার আমন চাষাবাদে বেশ উপকার হয়েছে।
কয়া পশ্চিমপাড়ার কৃষক রজব আলী বলেন, পোকামাকড় দমনে পার্চিং পদ্ধতি এবারই প্রথম তিনি প্রয়োগ করেছেন। আর জমিতে পার্চিং পদ্ধতি  কিভাবে লাগাতে হয় তা আমি আগে জানতাম না। তাই তাদের ব্লকের কৃষি বিভাগের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহ্বুবার রহমান এবারের নিজের হাতে তার আমন ক্ষেতে লাইফ পার্চিং অর্থাৎ ধৈঞ্চে গাছ এবং গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি লাগিয়ে দেন। সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি অফিসার হোমায়রা মন্ডল, বলেন, ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে পার্চিং পদ্ধতি একটি পরিবেশসম্মত কৃষিবান্ধব পদ্ধতি। আর পার্চিং পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ধৈঞ্চে বীজ সরবরাহ করা হয়। গত বছর অল্প পরিসরে কৃষকরা এ পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও এবারে উপজেলার কৃষকদের মাঝে পার্চিং পদ্ধতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তিনি বলেন এ ধরনের উদ্যোগ গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়া গেলে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।
সূত্র - দৈ. ইত্তেফাক

0 comments:

Post a Comment