আশরাফুল-যূঁথীর জৈব বালাইনাশক
কীটনাশক ও সার কৃষকের বন্ধু হওয়ারই কথা। কিন্তু উল্টো এটা শত্রু হয়েছে গোটা মানবজাতির। এসবের ব্যবহার পরিবেশ-চক্রে বিপদ ডেকে আনছে। সাময়িকভাবে ফলন ভালো হলেও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির। আর এটা কৃষকরা শিখেছেন নিজেদের জীবন থেকে, কোনো বইপুস্তক পড়ে নয়। নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাই মাটি, পানি, বাতাস বাঁচানোর যুদ্ধে নেমেছেন তাঁরা। তৈরি করেছেন মাটি ও পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ও জৈব সার। এসব নিয়ে সন্ধানীর এবারের আয়োজন।
লেখাপড়া তাঁরা বেশি করেননি। সম্পদ বলতে প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা। এই কৃষক দম্পতি কয়েক ধরনের জৈব বালাইনাশক, ফসলের ভিটামিন ও জৈব সার আবিষ্কার করেছেন। নিজেরা এগুলো ব্যবহার করে ভালো ফলন পেয়েছেন। শুধু তা-ই না, তাঁদের গ্রামের কৃষকরাও এসব ব্যবহার করে বেশি ফসল ঘরে তুলেছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার মলি্লকপুর গ্রামে এই দম্পতির বসত। আশরাফুল ইসলামের বয়স পঞ্চান্ন। স্ত্রী যঁূথীর চলি্লশ। নিজেদের তিন বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি পটল, বেগুন, ঝিঙা, পেঁপেসহ অন্যান্য সবজি চাষ করেন। আশরাফুল জানান, শুরুতে বাজারে চালু রাসায়নিক সার ও কীটনাশকই জমিতে ব্যবহার করতেন। ঘটনাটি ঘটল ২০০৮ সালে। ধান লাগিয়েছেন জমিতে। কিন্তু ভাইরাসে সব ধান নষ্ট হয়ে যায়। বললেন, 'মাথায় বাজ পড়ে। কিভাবে বাঁচব? কী করে খাব? বাবা-দাদারা তো গোবর সার দিয়েই চাষ করেছেন। সে সময় জমিও তরতাজা থাকত। জমি ফেলে রেখে আমি চিন্তা করতে থাকি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই ধান চাষ শুরু করি। গাছগাছড়া দিয়ে ফসল ফলাতে থাকি। পাশাপাশি আরো উন্নত জৈব সার ও বালাইনাশক তৈরির চেষ্টা করি। ইচ্ছা আছে সব ধরনের বালাইনাশকের পাশাপাশি ২২ রকম জৈব সার তৈরি করার।'
মলি্লকপুর গ্রামে আশরাফুলের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির পেছনে মাটির নিচে বড় আকারের আটটি মাটির কোলা পোঁতা। ওই সব কোলা থেকে আশরাফুল আর তাঁর স্ত্রী তরল কী সব বের করছেন। অনেকেই বোতলে তা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়ির অন্য পাশে একটি শেডের নিচে পোকারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ির পূর্ব পাশে কয়েকটি কবরের মতো কী যেন। সেখানে আশরাফুল কী যেন দেখছেন। আসলে এগুলো কবর নয়। জৈব সার তৈরির প্রাথমিক স্তর। এর নাম কবর কম্পোস্ট। আশরাফুলের আবিষ্কৃত আরেকটি উপাদান হচ্ছে জৈব ভিটামিন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক কেজি গাঁদা ফুল, এক কেজি দূর্বা, এক কেজি চেনুটেরে, এক কেজি হাতিশুল, দুই কেজি আগুন জ্বালা গাছ আর পরিমাণমতো গরুর চনা দিয়ে এই ভিটামিন তৈরি করা হয়েছে। এই মিশ্রণটি ছয় মাস রাখা যাবে। ফসলে স্প্রে করলে বেশি ফলন হবে। এ ছাড়া তিনি জৈব কীটনাশক উদ্ভাবন করেছেন। ৫০ গ্রাম কেরোসিন, ২০০ গ্রাম তামাক পাতা, ১০০ গ্রাম হুইল পাউডার ও গরুর চনা দিয়ে তৈরি এটি। আশরাফুলের দাবি, এই জৈব কীটনাশক পটল, বেগুন, সিমে স্প্রে করলে সব ধরনের পোকা মরবে। এ ছাড়া তিনি জাবপোকা দমনের জন্য নতুন ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, ২০ কেজি পানি, ২০০ গ্রাম তামাক পাতা, গরুর চনা, ৫০০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে এ ওষুধটি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রীও একটি জৈব বালাইনাশক আবিষ্কার করেছেন। যেটির নাম যঁূথী জৈব বালাইনাশক। যঁূথী জানান, ২০টি মেহেগনি ফল, এক কেজি নিমপাতা, এক কেজি নিম ছাল, এক কেজি ভাটির পাতা, ২০০ গ্রাম তামাক ও ২০ কেজি গরুর চনা দিয়ে এই বালাইনাশক তৈরি করা হয়েছে। মাজরা পোকা দমনে এটি খুবই কার্যকর। এ ছাড়া তিনি মাছের আঁইশ দিয়ে ফসল রক্ষার ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। এটি ফসলে স্প্রে করলে গরু-ছাগলে খাবে না। এসবের পাশাপাশি যূঁথী আবিষ্কার করেছেন জৈব ফসফেট। আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলেছেন, রাসায়নিক ফসফেটের চেয়ে তাঁর উদ্ভাবিত জৈব ফসফেট বেশি কার্যকরী। একধরনের মোটা পোকা স্থানীয় ভাষায় গুবরেপোকা নামে পরিচিত এটিই জৈব ফসফেট তৈরির মেশিন। যূঁথীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি হাউজ নির্মাণ করে তার ভেতরে এক স্তর কলাগাছ, এক স্তর গোবর সার দিয়ে ওই পোকা ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই পোকার মলই হচ্ছে জৈব ফসফেট। তিনি জানান, কলাগাছ, শজিনা গাছ কিংবা মরা তালগাছে এই পোকা পাওয়া যায়। হাউজে এই পোকা ছেড়ে দিলে বংশবিস্তার ঘটে। এসবের পাশাপাশি এই কৃষক দম্পতি মসুরের ভুসি, খেসারির ভুসি, দূর্বা, বাঁশের পাতা দিয়ে তৈরি করেছেন কবর কম্পোস্ট সার। তাঁরা জানান, এগুলো এক জায়গায় জড়ো করে কবরের মতো আকৃতি করে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। তিন মাস পরই তা সারে পরিণত হবে। এই সার ফসলের জন্য খুবই উপকারী। আর্থিক দিক দিয়ে সাশ্রয়ী। এমনকি এই জৈব সার ফসলের ক্ষেতে তিন-চার বছর ব্যবহার করলে ফসল উৎপাদনের জন্য ক্ষেতে আর কোনো সার দিতে হবে না। আবিষ্কারকরা বললেন, তাঁদের জৈব বালাইনাশক ২০ টাকা লিটার দামে গ্রামের কৃষকরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সবাই উপকৃত হচ্ছেন। ওই গ্রামের কৃষক রেজাউল, খাদেম, রজব আলী, মোশারেফ, গফুর, শহীদ জানান, তাঁরা আশরাফুল-যূঁথীর বালাইনাশক ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়েছেন। আশরাফুল বলেন, 'অতীতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বাবদ বছরে আমার ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন এ টাকা সাশ্রয়ের পাশাপাশি আমি ফলনও বেশি পাচ্ছি। বিশ্বাস করি, 'আমার বালাইনাশক সার ব্যবহার করলে প্রতিবছর দেশের কোটি কোটি টাকা বাঁচবে। ফসল উৎপাদন বাড়বে। পরিবেশ রক্ষা পাবে। কৃষকরা উপকৃত হবেন। মানবদেহের কোনো ক্ষতি হবে না।'সূত্র - দৈনিক কালের কন্ঠ, লিখেছেন ফখরে আলম







0 comments:
Post a Comment